আঙ্কারা, ১৩ এপ্রিল (বাসস) : বাংলাদেশ ও তুরস্ক সরকার দু'দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে একটি অবাধ বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদন এবং চট্টগ্রাম-ইস্তাম্বুল ফ্লাইট সার্ভিস চালুর ব্যাপারে সম্মত হয়েছে।
শেখ হাসিনা আজ আঙ্কারায় শেরাটন হোটেলে তুরস্কের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্য সংস্থা তুসকনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠককালে এ কথা বলেন।
তিনি উভয় দেশের স্বার্থে বাংলাদেশ থেকে আরো বেশি বিশ্বমানের পণ্য আমদানি করার জন্য তুরস্কের ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশ তুরস্কে এখন পর্যন্ত সীমিত পরিমাণে কেবলমাত্র তৈরি পোশাক ও পাটের সুতা রফতানি করে থাকে। অথচ আপনারা বাংলাদেশ থেকে তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে সিরামিক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হিমায়িত চিংড়ি, পাটের তৈরি পণ্য, হস্তশিল্প সামগ্রী, সাইকেল ও অন্যান্য অনেক পণ্য আমদানি করতে পারেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ওষুধ প্রস্তুতকারী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব শিল্পগুলো কেবলমাত্র আমাদের চাহিদার ৯০ শতাংশের বেশি পূরণই করে না, বরং বিশ্বের প্রায় ৮৩টি দেশে সাশ্রয়ী মূল্যে উচ্চ মানসম্পন্ন ওষুধ রফতানি করে।’
শেখ হাসিনা তুরস্কের ব্যবসায়ীদের প্রতি সে দেশের জনগণের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত ওষুধ সরবরাহের লক্ষ্যে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের এই অভাবনীয় অগ্রগতির সুবিধা গ্রহণের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক দিক থেকে তুরস্ক ও বাংলাদেশের মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক বিরাজমান। অথচ এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে তুর্কি বিনিয়োগ যথেষ্ট কম।
তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে ব্যবসার পরিমাণ সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কম- অর্থাৎ কেবলমাত্র প্রায় একশ’ কোটি মার্কিন ডলার। তিনি আরো বলেন, ২০১০ সালের নভেম্বরে তুর্কী প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরকালে উভয় দেশ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ২০১৫ সাল নাগাদ অন্তত তিনশ’ কোটি মার্কিন ডলারে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, তুসকন এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ আমাদের অঞ্চল এবং এর বাইরের অঞ্চলগুলোর মধ্যে একটি অন্যতম সেরা বিনিয়োগ সুযোগের প্রস্তাব করছে। ‘আমার মনে হয়, আপনারা ১০ এপ্রিল ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ বিজনেস এন্ড ইনভেস্টমেন্ট ফোরামে বাংলাদেশে বিনিয়োগ সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে আলোচনা করেছেন।’
তিনি বলেন, বাংলাদেশ আপনাদের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত প্রয়োজন ভালোভাবে মেটানোর জন্য ইতোমধ্যে ইস্তাম্বুলে কনসুলেট জেনারেল খুলেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার বাংলাদেশকে চীন ও ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ভৌগোলিক অবস্থানের সুযোগ নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই অবস্থান আমাদের এই অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য কৌশলগতভাবে সবচেয়ে ভালো পছন্দে পরিণত করেছে।’
তিনি বলেন, বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশ সড়ক, রেল, সমুদ্র ও বিমান যোগাযোগের ক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্নতি করেছে। ফলে এ অঞ্চলে ২শ’ কোটিরও অধিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আপনাদের বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি- স্বচক্ষে দেখুন বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত যত্নসহকারে আপনাদের জন্য বিনিয়োগ অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।’
অনুষ্ঠানে তুসকনের সবাপতি রেজানুর মিরাল ও বাংলাদেশ ফেডারেশন অব চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সভাপতি এ কে আজাদও বক্তৃতা করেন।
পরে টার্কিস ইউনিয়ন অব চেম্বার্স এ্যান্ড কমোডিটি এক্সচেঞ্জেস ইউনিয়ন (টিওবিবি) আয়োজিত মধ্যাহ্ন ভোজসভায় ভাষণদানকালে প্রধানমন্ত্রী তুরস্ককে বিশ্বস্ত বন্ধু ও বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে পেতে ঢাকার আগ্রহের কথা ব্যক্ত করেন।
‘স্বাধীনতার পর থেকে আমরা তুরস্কের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বিষয় একে অপরকে সমর্থন দিয়ে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে আসছি’- এ কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তুরস্কের শিল্প উদ্যোক্তাদের পারস্পরিক স্বার্থে বাংলাদেশের দেয়া সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগানোর আহবান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মহাসড়ক, সাবওয়ে, মনো-রেল, রেল রোড ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো প্রধান অবকাঠামো নির্মাণে বাংলাদেশ সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) নীতি গ্রহণ করেছে। দেশটি তৃতীয় সমুদ্র বন্দর ও গভীর সমুদ্র বন্দরের পাশাপাশি একটি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ ভারত ও চীনের কাছাকাছি ভৌগোলিক কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে এবং নেপাল, ভুটান, মায়ামনার ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে আঞ্চলিক সংযোগস্থল তিনশ’ কোটি লোকের একটি বাজারের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে এবং এ অঞ্চলের ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাকৃতিক আঞ্চলিক কেন্দ্র।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফআইডি) সবচেয়ে উদার নীতি গ্রহণ করেছে। একশ’ শতাংশ বৈদেশিক মূলধন বিনিয়োগের বৈধতা দিয়েছে, সহজে প্রাপ্ত লাভ ও মুনাফার অর্থ দেশে পাঠানোর সুযোগ রয়েছে, কর রেয়াত, মেশিনারি আমদানিতে শুল্ক রেয়াত এবং মূলধন ও ডিভিডেন্টের ক্ষেত্রে পূর্ণ প্রত্যাবাসনের সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের শ্রমঘন শিল্পে তুরস্কের ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করে ইইউ এবং অন্যান্য উন্নত দেশের বাজার সুবিধা নিয়ে ব্যাপক লাভবান হতে পারে।
তুরস্কের শিক্ষামন্ত্রী ওমর দিনকার এফবিসিসিআই সভাপতি এ কে আজাদ এবং টিওবিবি সভাপতি রিফাত হিসারকিকহোসলু অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন।